সব বাঁধা পিছনে ফেলে আমাদের মাঝে বেড়ে উঠা শাবিপ্রবির ফারিহা

প্রকাশিত: ৯:০৯ পূর্বাহ্ণ, মে ২৫, ২০২১

দেলোয়ার হোসেন, শাবিপ্রবিঃ

মানুষ আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন নিয়ে বড় হয়। জীবনে নানান প্রতিকূলতাকে পিছনে ফেলে এভারেস্টের সর্বোচ্চ চঁড়া থেকে শুরু করে মহাকাশ ছোঁইয়ার স্বপনে উত্তীর্ণ হবার মানব ইতিহাস রচনা হয়েছে অনেক আগেই। আজকে যার কথা বলব সে মেয়েটির স্বপ্নটা আকাশ ছোঁয়া! কিন্তু আট-দশ জনের মতো স্বাভাবিক জীবন তাঁর নয়। জন্ম থেকেই দুই হাত এবং এক পা অস্বাভাবিক। পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতে পারতো না বলে মা বাবার কোলটাই ছিল যেন তার একমাত্র বাহন। এই কোল থেকেই সে স্বপন জয়ের তীব্র প্রতিযোগিতায় যাত্রা শুরু করে। হাতে কলম নিয়ে খাতায় লেখা ছিল তার জন্য অনেক কষ্টের। তবুও হার মানে নি সে মেয়ে! শরীরে দুর্বল হলেও মন ও ইচ্ছের দিক থেকে অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ফারিহা মনি। তার চারপাশের বাকিদশজনের কাছে স্বপন জয়ের মাঠ যতটা সহজ ছিল তার কাছে তা ঠিক ওইরকম্ভাবে সহজ ছিল না। সে সকল প্রতিবন্ধকতা জয় করে এখন পড়াশোনা করছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) ইংরেজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের।
ফারিহার জন্ম হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার আমুকুনা গ্রামে। ফারিহা জানান, জন্ম থেকেই তার এ সমস্যা। আর শারীরিক এই প্রতিবন্ধকতার মাঝে বেড়ে উঠা হলেও তার কাছে অন্যদের মতোই একটা স্বাভাবিক জীবন মনে হয়। তারপর যতটুকু তার মনে পড়ে স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগেই তার মা তাকে বাড়িতে পড়ানোর চেষ্টা করতেন। সেই হিসেবে বলা যায় পড়াশোনার হাতেখড়ি তার মায়ের হাত ধরে। সে সময় বর্ণমালা চিনতে বেশি সময় না লাগলেও লেখা শিখতে আমার অনেক সময় লেগেছে। পরে স্কুলে যাওয়ার মতো বয়স যখন হয় তখন তাকে পাশের গ্রামের প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি করানো হয়েছিল। একদিকে তার পায়ে সমস্যা অন্যদিকে স্কুলটাও তার বাড়ি থেকে অনেক দূরে তাই নিজের পায়ে হেঁটে স্কুলে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। কখনো বাবা, কখনো মা আবার কোন কোন সময় বাড়ির অন্য কেউ তাকে কোলে করে স্কুলে দিয়ে আসতো আবার স্কুল ছুটি হলে নিয়ে আসতো।
তিনি বলেন, “পড়াশোনাতে মনোযোগী ছিলাম বলে শিক্ষকরা আমাকে অনেক আদর করতেন। তাঁরা আমাকে সবসময় উৎসাহ দিতেন। ১ম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর থেকে ৫ম পর্যন্ত ক্লাসে আমি সবসময়ই ফাস্ট হয়েছিলাম। আমি যখন ৩য় শ্রেণিতে তখন আমার মা-বাবা ব্রাক পরিচালিত ১টা হাসপাতালের নেন। সেখানে কৃত্রিম পা লাগানো হয়। আমারও কৃত্রিম পা লাগানো হলো। এই কৃত্রিম পা আমার চলার পথ অনেক সহজ করে দিয়েছে। পা লাগানোর পর থেকে আমি একাই স্কুলে যাতায়াত করেছি। তখন থেকে নতুন করে শুরু হয় নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যুদ্ধ।”
ফারিয়া আরও বলেন, চলার পথটা হয়তো এতোটা মসৃণ ছিল না কখনো, বন্ধুরও ছিল না। আমার জীবনে যা সম্ভব হয়েছে তা একমাত্র আমার পরিবারের জন্য। গ্রামের স্কুল থেকে পড়াশোনা করা। অতিরিক্ত সুযোগ সুবিধা কখনো নেইনি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের দলেই ছিলাম সব সময়। আউশকান্দি রশিদিয়া পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে মানবিক বিভাগ থেকে এস.এস.সি ও এইচ.এস.সি পরীক্ষায় পাশ করি। পরে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে শাবিতে আমি এ ইউনিট থেকে মেধাতালিকায় ২২তম স্থান অর্জন করি। এখন পর্যন্ত কোথাও প্রতিবন্ধী কোঠা দিয়ে ভর্তি হইনি। সামনেও কখনো এ সুযোগ নিবো না। পড়াশোনা শেষ করে নিজের যোগ্যতায় সরকারি চাকরি করে মা বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আমাকে এমন একটা পরিবারে দেয়ার জন্য। তাঁরা কখনো আমাকে বোঝা হিসেবে দেখেননি তাঁদের জন্য আমি আজকের আমি।